স্মৃতির প্রাঙ্গণে ভূত চতুর্দশীর মায়াবী সন্ধ্যা
অঙ্কিতা চ্যাটার্জ্জী, নিউজ হিন্দুস্থান -:
কার্তিকের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে প্রকৃতির বুক চিরে নেমে আসে এক অদ্ভুত রহস্যময়তা। সন্ধ্যার মৃদু আবছায়া আর বাতাসে শীতের প্রথম হিমেল পরশ জানান দেয় এক অনন্য সন্ধিক্ষণের। কালীপুজোর অমাবস্যার গভীর অন্ধকার নামার ঠিক আগের এই ক্ষণটি যেন জীবদ্দশা ও স্মৃতির ওপারে থাকা অশরীরী জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত সেতু। বাহ্যিক নামকরণে ভয়ের মৃদু শিহরণ থাকলেও, ভূত চতুর্দশীর অন্তরে নিহিত রয়েছে পূর্বপুরুষের প্রতি নিখাদ শ্রদ্ধা, স্মৃতির প্রতি আজীবন আনুগত্য এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে আলোর চিরন্তন প্রার্থনা।
এই পবিত্র সন্ধ্যায় চোদ্দ পুরুষের আত্মার স্মরণে ঘরের কোণায় কোণায় জ্বলে ওঠে চোদ্দটি মাটির প্রদীপ। মিটিমিটি জ্বলে ওঠা সেই ছোট ছোট শিখাগুলো কেবল আলোকবিন্দু নয়; ফেলে আসা শিকড় এবং অতীতে হারিয়ে যাওয়া আপনজনদের সঙ্গে বর্তমানের এক নীরব অথচ নিবিড় কথোপকথন। এই প্রদীপগুলো মনে করিয়ে দেয়, স্মৃতির খাতায় মৃত বলে কেউ হারিয়ে যায় না, আলো হয়ে মিশে থাকে জীবনের প্রতিটি কোণায়।
এই দিনে চোদ্দ শাক খাওয়ার ঐতিহ্যও বাঙালির মননশীলতাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়। এর পেছনে রয়েছে বিশ্বাসের সঙ্গে ব্যবহারিক জীবনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। একাধারে অশুভ শক্তির প্রভাব দূর করার লোকবিশ্বাস, অন্যদিকে ঋতু পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভেষজ উপাদান গ্রহণের প্রাচীন জ্ঞান- দুটোই মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। প্রাকৃতিকের সঙ্গে মানুষের এই নিবিড় সখ্যই বাংলার লোকায়ত জীবনকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা।
ভূত চতুর্দশীর রাতে অশরীরী আত্মাদের মর্ত্যে বিচরণের কথা যেমন প্রচলিত, তেমনই প্রবীণদের বিশ্বাস- পূর্বপুরুষেরা তাঁদের উত্তরসূরিদের ভালোবেসে আশীর্বাদ করতে এই মায়াবী রাতে ফিরে আসেন ঘরের আঙিনায়। লোকবিশ্বাসের কোনো পরীক্ষিত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও, তা মানুষের মনে বিস্ময়, ভক্তি এবং স্মৃতির এক স্বতন্ত্র আবহ তৈরি করে। পুরাণের বৃহত্তর পটে আলো ও অন্ধকারের এই চিরন্তন দ্বন্দ্ব আসলে শুভ ও অশুভের রূপক। চতুর্দশীর চোদ্দ প্রদীপ তাই কেবল বাইরের অন্ধকার তাড়ায় না, মানুষের অন্তরের সংশয়, ভয় ও অজ্ঞানতার কালিমা মুছে ফেলে এক নতুন চেতনার আলো জ্বেলে দেয়।
আজকের যান্ত্রিক ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক জীবনেও ভূত চতুর্দশী বাঙালিকে অবলীলায় ফিরিয়ে নিয়ে যায় তার নাড়ির টানে। শৈশবের সেই ঠাকুমার মুখে শোনা রূপকথা-ভূতকথা, মায়ের হাতে চোদ্দ শাকের পরিচিত গন্ধ আর সন্ধ্যেবেলায় সযত্নে প্রদীপ জ্বালানোর সেই স্নিগ্ধ ব্যস্ততা- সব মিলিয়ে এই দিনটি হয়ে ওঠে এক নস্ট্যালজিক আবেগঘন কাব্যিক অধ্যায়।
ভূত চতুর্দশীর চোদ্দ প্রদীপ নীরবে এক অবিনাশী সত্য ঘোষণা করে-অন্ধকার যতই গভীর ও দীর্ঘ হোক না কেন, মানুষের অকৃত্রিম বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং স্মৃতির শিখা কস্মিনকালেও নিভে যাওয়ার নয়।
Comments
Post a Comment