মৃন্ময় থেকে চিন্ময়ী: কুমারী আরাধনায় নারীশক্তির অনন্ত প্রকাশ
অঙ্কিতা চ্যাটার্জ্জী, নিউজ হিন্দুস্থান -:
দুর্গাপুজোর ঢাক যখন শরতের আকাশে ছন্দ তোলে, ধূপের ধোঁয়া যখন মিশে যায় শিউলির গন্ধে, তখনই বাংলার মন্দিরে-মণ্ডপে আর এক গভীর আধ্যাত্মিক মুহূর্তের জন্ম হয়—‘কুমারী পুজো’। প্রতিমার মৃন্ময় চোখের পাশাপাশি জীবন্ত এক কন্যার চোখে দেবীকে খুঁজে নেওয়ার এই প্রাচীন সাধনা যেন নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানের এক অনন্ত বার্তা।
পুরাণ, বিশ্বাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, কুমারী হলেন আদ্যাশক্তিরই এক জীবন্ত প্রতীক। প্রচলিত বিশ্বাস, বানাসুর বা কোলাসুরের অত্যাচারে যখন স্বর্গ-মর্ত্য বিপন্ন, তখন দেবতাদের আহ্বানে মহাশক্তি মানব-কন্যারূপে আবির্ভূত হয়ে কুমারীরূপে অসুরবধ করেন। সেই থেকেই মর্ত্যে কুমারী আরাধনার সূচনা- এমনই কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে।
আর এক কাহিনিতে রাম-রাবণের যুদ্ধের প্রসঙ্গ উঠে আসে। রাবণবধের জন্য দেবতারা যখন আদ্যাশক্তির শরণাপন্ন, তখন দেবীকে তুষ্ট করার পরামর্শ দেওয়া হয় বেলগাছতলায় বোধনের মাধ্যমে। কথিত আছে, সেখানে একটি শিশুকন্যাকে দেখতে পান ব্রহ্মা। দেবতারা সেই কন্যার পুজো করে দেবীর কৃপা লাভ করেন। বিশ্বাসীদের মতে, সেখান থেকেই দুর্গাপুজোর সঙ্গে কুমারী পুজোর সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়ে ওঠে।
ঋগ্বেদের দেবীসূক্ত, তৈত্তিরীয় আরণ্যক, বিভিন্ন পুরাণ এবং মহাভারতের ভীষ্ম ও বিরাট পর্বেও কুমারী আরাধনার উল্লেখ পাওয়া যায় বলে শাস্ত্রবিশ্বাস। সাধারণত ঋতুমতী হওয়ার আগে নির্দিষ্ট বয়সের কন্যাকে কুমারী হিসেবে পুজো করা হয়। মহাষ্টমী বা নবমী তিথিতেই এই আরাধনা বেশি প্রচলিত। দুর্গাপুজোর পাশাপাশি কালীপুজো, জগদ্ধাত্রীপুজো ও অন্নপূর্ণা পুজোতেও কোথাও কোথাও এই রীতি পালিত হয়।
বেলুড় মঠ ও রামকৃষ্ণ ভাবধারার সঙ্গে কুমারী পুজোর একটি বিশেষ ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শ্রীশারদাদেবীকে ষোড়শী জ্ঞানে পূজা করার ঘটনা নারীকে দেবীরূপে দেখার এক গভীর আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রতীক। স্বামী বিবেকানন্দও কুমারীর মধ্যে দেবীভাবের প্রকাশ দেখেছিলেন। তাঁর কাছে দেবী কোনও জাতি, ধর্ম বা বর্ণের গণ্ডিতে আবদ্ধ নন- প্রত্যেক কুমারীর মধ্যেই রয়েছে মাতৃশক্তির সম্ভাবনা।
দর্শনের গভীরে তাই এক সহজ অথচ শক্তিশালী উপলব্ধি- সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের যে ত্রিশক্তি বিশ্বকে ধারণ করে, তার বীজ নিহিত রয়েছে নারীত্বের মধ্যেই। সরলতা, নিষ্পাপতা, ভালোবাসা ও নিরহঙ্কারের প্রতীক কুমারীর মধ্যে সেই শক্তিকে অনুভব করাই এই সাধনার মূল কথা।
সময়ের স্রোতে কুমারী পুজোর প্রচলন অনেক জায়গায় কমে এলেও তার অন্তর্নিহিত বার্তাটি আজও অমলিন। প্রতিমার সামনে প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি যদি জীবন্ত নারীকে সম্মান করার আলো জ্বলে ওঠে, তবেই হয়তো পূর্ণতা পায় দেবীর আরাধনা।
তাই শরতের প্রার্থনায় আজও ধ্বনিত হয়- “যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা,
নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ, নমো নমঃ।”
কুমারীর চোখে তখন শুধু একটি শিশুর মুখ নয়- দেখা যায় জগন্মাতার স্নেহময়, জ্ঞানময়, মঙ্গলময় এক চিরন্তন প্রতিচ্ছবি।
Comments
Post a Comment