কলাবউয়ের আড়ালে মহাশক্তি!
বাসুদেব চ্যাটার্জ্জী, আসানসোল-:
শিউলির সুবাস, ঢাকের বোল আর উলুধ্বনির আবহে সপ্তমীর ভোরে নদীজলে স্নাত হন প্রকৃতির নয় রূপ। লালপাড় সাদা শাড়িতে আবৃত নবপত্রিকা যেন স্মরণ করিয়ে দেয়- মাটির বুকেই লুকিয়ে রয়েছে মহাশক্তির চিরন্তন প্রকাশ।
দুর্গাপুজোর অন্যতম প্রাচীন ও তাৎপর্যপূর্ণ আচার- নবপত্রিকা স্নান। নদী কিংবা পুকুরের জলে শাস্ত্রবিধি মেনে স্নান করিয়ে, নতুন লালপাড় সাদা শাড়িতে আবৃত করে মণ্ডপে নিয়ে আসা হয় একগুচ্ছ সবুজ উদ্ভিদকে। সিঁদুরের রাঙা স্পর্শে, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ঢাকের বোলে প্রকৃতির এই সমাহার হয়ে ওঠে দেবীবন্দনার জীবন্ত প্রতীক।
গণেশের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শাড়ি পরানো কলাগাছটি কি সত্যিই ‘কলাবউ’, গণেশের স্ত্রী? শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় নবপত্রিকা গণেশের পত্নী নন। গণেশের দুই পত্নী হিসেবে রিদ্ধি ও সিদ্ধির নাম প্রচলিত। নবপত্রিকা আসলে দুর্গাপুজোর এক বিশেষ পূজ্যরূপ, যার মধ্যে নিহিত রয়েছে প্রকৃতি, কৃষিজীবন এবং দেবীশক্তির আরাধনা।
‘নবপত্রিকা’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ন'টি পাতা। ন'টি পৃথক উদ্ভিদ একত্র করে দেবীর প্রতীকী রূপ নির্মাণ করা হয়। সেগুলি হল- কলাগাছ, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু এবং ধানগাছ। একটি সপত্র কলাগাছের সঙ্গে বাকি আটটি উদ্ভিদ বেঁধে সাদা অপরাজিতা লতা ও বেলের সাহায্যে একত্র করা হয়। তার পর পরানো হয় লালপাড় সাদা শাড়ি। ঘোমটা টানা সেই সবুজ অবয়ব যেন বাঙালির চিরচেনা বধূরূপে প্রকৃতিরই এক পবিত্র প্রতিচ্ছবি।
প্রচলিত ধর্মীয় ব্যাখ্যায় নয়টি উদ্ভিদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নয় দেবীর অধিষ্ঠান- কলায় ব্রহ্মাণী, কচুতে কালিকা, হলুদে উমা, জয়ন্তীতে কার্ত্তিকী, বেলে শিবা, ডালিমে রক্তদন্তিকা, অশোকে শোকরহিতা, মানে চামুণ্ডা এবং ধানে লক্ষ্মী। অর্থাৎ, শস্য, ফল, ঔষধিগুণসম্পন্ন উদ্ভিদ ও বনজ সম্পদের মধ্যে দিয়েই এখানে দেবীশক্তির বহুরূপী প্রকাশ কল্পনা করা হয়েছে।
মহাসপ্তমীর সকালে পুরোহিত নবপত্রিকাকে নিয়ে যান নিকটবর্তী নদী বা পুকুরে। কোথাও শঙ্খ বাজে, কোথাও মহিলাদের উলুধ্বনি আর ঢাকের আওয়াজে মুখরিত হয় চারপাশ। শাস্ত্রীয় বিধি মেনে স্নানের পর নবপত্রিকাকে শাড়ি পরিয়ে মণ্ডপে ফিরিয়ে আনা হয়। দেবীর ডান দিকে, প্রচলিত রীতিতে গণেশের পাশে, নির্দিষ্ট আসনে স্থাপন করে শুরু হয় পূজার পরবর্তী পর্ব।
এই আচার নিছক কয়েকটি গাছকে সাজিয়ে মণ্ডপে রাখার অনুষ্ঠান নয়। কৃষিনির্ভর বাংলার জীবনে ধান মানে অন্ন, কলা মানে প্রাচুর্য, হলুদ মানে মঙ্গল, আর সবুজ উদ্ভিদ মানে প্রাণের অবিরাম প্রবাহ। তাই নবপত্রিকার আরাধনায় দেবীকে খুঁজে পাওয়া যায় মাঠের ফসলে, বৃক্ষের ছায়ায়, মাটির উর্বরতায় এবং মানুষের জীবনধারণের প্রতিটি উপাদানে।
নবপত্রিকা পূজার শেকড় সন্ধান করতে গিয়ে গবেষকদের মুখে ভিন্ন ভিন্ন মত শোনা যায়। প্রাচীন মার্কণ্ডেয় পুরাণ বা দেবীভাগে নবপত্রিকার স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলেও কালিকা পুরাণ এবং কৃত্তিবাসী রামায়ণে এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কবি কৃত্তিবাস রায়ে লিখেছিলেন- "বাঁধিলা পত্রিকা নব বৃক্ষের বিলাস।"
ইতিহাসবিদ ও পন্ডিতদের একাংশের মতে, প্রাচীনকালে শবর উপজাতির মানুষেরা নয়টি ভিন্ন গাছের পাতা বা ডাল সামনে রেখে প্রকৃতির নবরাত্রি উৎসব পালন করতেন। কালক্রমে লোকায়ত সেই শবর সংস্কৃতির ধারা এবং শস্যদেবীর আরাধনার ভাবনার সঙ্গেই বৈদিক দুর্গোৎসবের মেলবন্ধন ঘটে। বিশিষ্ট গবেষক যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধিও একে এক অনন্য আগন্তুক ও লোকায়ত ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
নবপত্রিকা কেবল পৌরাণিক আচার নয়; এটি আমাদের শেখায় প্রকৃতি ও জনজীবনের নিবিড় সম্পর্কের কথা। কলা থেকে শুরু করে ধান - এই উদ্ভিদগুলো মানবজীবনের খাদ্য, ঔষধি গুণ এবং বেঁচে থাকার উপকরণের প্রতীক।
বিশ্বাসের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। নবপত্রিকা সেই ভাষায় বলে- প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে দেবীর আরাধনা সম্পূর্ণ হয় না। যে মাটি অন্ন দেয়, যে বৃক্ষ ছায়া দেয়, যে শস্য মানুষের জীবন বাঁচায়, তাদের মধ্যেও বিরাজ করেন মহাশক্তি।
সপ্তমীর সকালে তাই শাড়ি পরানো কলাগাছটির দিকে তাকালে শুধু ‘কলাবউ’ নয়, চোখে পড়ে প্রকৃতির পূর্ণতা, কৃষিজীবনের কৃতজ্ঞতা এবং বাংলার লোকবিশ্বাসের সুদীর্ঘ যাত্রা। নবপত্রিকা যেন মনে করিয়ে দেয়, দেবী দুর্গা কেবল অসুরদলনী নন- তিনি অন্নের আশ্বাস, জীবনের স্পন্দন, সবুজ পৃথিবীর অন্তর্নিহিত শক্তি।
শিউলির গন্ধমাখা সেই ভোরে তাই প্রকৃতির প্রতিটি পাতায় উচ্চারিত হয় এক চিরন্তন প্রার্থনা- প্রকৃতিতে শক্তি, শস্যে সমৃদ্ধি, আর জীবনের প্রতিটি স্পন্দনে মায়ের আবাহন।
Comments
Post a Comment