পার্কস্ট্রিটের পিচে সভ্যতার কঙ্কাল: দুধের কড়া নামিয়ে বড়াইয়ের মন্ত্রী ও ভেকধারী নগর-উন্নয়ন
রামকৃষ্ণ চ্যাটার্জ্জী, নিউজ হিন্দুস্থান -:
চকচকে অ্যাসফল্টে মোড়া পার্কস্ট্রিটের ফুটপাত- যেখানে বুটজুতার অভিজাত মটমট শব্দ আর কর্পোরেট সুগন্ধির ভিড়ে গরিবের অস্তিত্ব এক আস্ত কলঙ্ক। কিন্তু সেই কংক্রিটের ওমে যখন এক অসহায় মা তাঁর শীর্ণ শিশুর জন্য স্টোভে দুধ গরম করছিলেন, তখন তা সভ্যতার চোখে ‘শৃঙ্খলার পরিপন্থী’ হয়ে ওঠে। মন্ত্রীর পবিত্র নজর এড়াল না ফুটপাতের সেই ‘অপরাধ’! হুকুম হলো, অবিলম্বে বন্ধ হোক রান্না। মায়ের কাতর আর্জি, দুধটা নিজের নয়, অবুঝ বাচ্চার ক্ষুধার জ্বালা মেটানোর- কিন্তু কে শোনে কার কথা? আইনের অন্ধ খড়্গ নেমে এল, আর নিভে গেল দুধের কড়া।
প্রশ্ন ওঠে, ফুটপাত খালি করার আইনি দায়িত্ব কি তবে মানবতা বিসর্জনের লাইসেন্স? আইন বলতেই পারে ফুটপাথে উনুন চলবে না, কিন্তু সেই মুহূর্তে কি একটুও মায়া দেখানো যেত না? দুধটুকু গরম হতে দিয়ে শিশুটিকে খাইয়ে নেওয়ার সামান্য সময়টুকু দিলে রাষ্ট্র বা প্রশাসন কি রসাতলে যেত? না কি তাতে মন্ত্রীর ক্যামেরাবন্দি ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ ইমেজে একটু ধুলো লাগত?
আজকের দিনে প্রশাসন মানেই লাইভ টেলিকাস্ট আর সোশ্যাল মিডিয়ার বাহবা কুড়ানোর সস্তা ফন্দি। গরিবের পেটে লাথি মেরে সেই দৃশ্যকে উন্নয়নের প্রসাধন হিসেবে ফেসবুকে কপচালেই বুঝি রাজনীতির সার্থকতা মেলে। জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের ক্ষমতার ঔদ্ধত্যে ভুলে যান যে, ফুটপাথে সংসার পাতা কোনও মানুষের শখের বিলাসিতা নয়, এই সমাজেরই চরম অসম বণ্টনের রূঢ় পরিণতি। হকার বা ফুটপাথবাসীকে উচ্ছেদ করলেই যদি শহর সিঙ্গাপুর হয়ে যেত, তবে তো মিটেই গেল! কিন্তু তাদের পুনর্বাসনের ছক কার টেবিলে জমে থাকে, তা কেউ দেখে না।
শহর সুন্দর হোক, ফুটপাত পথচারীর জন্য উন্মুক্ত হোক- এতে দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের দাম যদি হয় একটি ক্ষুধার্ত শিশুর মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়া, তবে ওই চকচকে শহরের নিচে লুকিয়ে থাকা আভিজাত্য আসলে এক আদিম বর্বরতা মাত্র। ফুটপাত থেকে জবরদখল তোলা প্রশাসনের কাজ হতে পারে, কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে বুক থেকে সমবেদনা মুছে ফেলা সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরাজয়।
Comments
Post a Comment