উৎসবের ধূলিশয্যায় নিভৃত হাহাকার: জামুড়িয়ায় মানবিকতার পরাভব
অঙ্কিতা চ্যাটার্জ্জী, নিউজ হিন্দুস্থান -:
যে প্লাস্টিকের চাদরটুকু ভিজে যাওয়া কুঁড়েঘরের শেষ সম্বল হতে পারত, যে ত্রিপলটুকু রোদে পোড়া আর জলে ভেজা এক অসচ্ছল পরিবারের মাথার ওপর এক টুকরো আড়াল এনে দিতে পারত- সেই সরকারি সহায়তাই আজ জামুড়িয়া সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক দপ্তরের ধূলামলিন মেঝেসজ্জায় রূপ নিয়েছে। অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয় যখন লালফিতের ফাঁসে আটকা পড়ে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে মরে, ঠিক তখনই সেই পরম প্রার্থিত সরকারি ত্রিপল মাটিতে বিছিয়ে মহাসমারোহে উদযাপিত হলো রাখিবন্ধন উৎসব।
মাটির ধুলো ঢাকতে সরকারি ত্রিপল পাতায় কোনো কার্পণ্য দেখায়নি প্রশাসন, অথচ খোলা আকাশের নিচে থাকা পরিবারটির কাছে একটি ত্রিপল পৌঁছানো যেন পর্বতপ্রমাণ কাজ! উৎসবের সুসজ্জিত মঞ্চ থেকে যে ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বার্তা উচ্চারিত হলো, তা এই দৃশ্যমান বৈপরীত্যের সামনে এসে এক চরম উপহাসে পরিণত হয়েছে। সম্প্রীতির অলঙ্কৃত সুতোয় সাজানো অনুভূতির নিচে ঢাকা পড়ে গেল বিপন্ন মানুষের বাঁচার মৌলিক অধিকার।
এই নগ্ন অপচয় ও অগ্রাধিকারের বিপর্যয় নিয়ে ক্ষুব্ধ নাগরিকদের কণ্ঠস্বর যখন সোচ্চার হয়ে উঠল, তখন প্রশাসনিক শীর্ষস্থান থেকে ভেসে এল এক হিমশীতল ঔদাসীন্য। অভিযোগকে ‘গুরুত্বহীন’ এবং ‘নৈমিত্তিক বিষয়’ বলে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার যে মানসিকতা ধরা পড়ল, তা সাধারণ মানুষের আত্মসম্মানে যেন আরও একপ্রস্থ নুন ছিটিয়ে দিল। মানুষের মৌলিক সংকট যেখানে দাপ্তরিক ফাইল বন্দি, সেখানে ধূলি ধূসরিত ত্রিপলে দাঁড়িয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখাই যেন মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
জামুড়িয়ার এই করুণ ছবি কেবল এক টুকরো প্লাস্টিক বঞ্চনার আখ্যান নয়; এ হলো নিস্তেজ হয়ে পড়া প্রশাসনিক সংবেদনশীলতার এক স্পষ্ট দলিল। যে রক্ষাবন্ধন রক্ষার অঙ্গীকার শেখায়, সেই উৎসবেই সরকারি সম্পদের এমন আত্মকেন্দ্রিক প্রদর্শন দেখে আজ সাধারণ মানুষের মনে একটাই ব্যাকুল প্রশ্ন জাগে - উৎসবের জাঁকজমকে মাটি ঢাকাই যদি চূড়ান্ত অগ্রাধিকার হয়, তবে আশ্রয়হীন মানুষের মাথার ছাদ নিশ্চিত করবে কে?
Comments
Post a Comment