বিশ্বের দরবারে ভারতের নাম উজ্জ্বল করল কুলপির মেয়ে নফিসা খাতুন, অনূর্ধ্ব-২৩ এশিয়ান অ্যাথলেটিক্সে স্বর্ণপদক জয় করল
রমেশ রায়, কুলপি:- দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলপি ব্লকের বেলপুকুর গ্রাম পঞ্চায়েতের রাঙ্গাফলা গ্রামের মেয়ে নফিসা খাতুন অনূর্ধ্ব-২৩ এশিয়ান অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ৪০০ মিটার দৌড়ে স্বর্ণপদক জিতে দেশের পাশাপাশি নিজের জেলা ও গ্রামের নাম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উজ্জ্বল করেছে। চীনে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে সোনা জিতে দেশে ফেরার পর গোটা এলাকায় উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে।
একটি প্রত্যন্ত ও সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া নফিসার ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। গ্রামের রাস্তায় নিয়মিত অনুশীলনের মধ্য দিয়েই তাঁর অ্যাথলেটিক্স জীবনের সূচনা হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিকে অতিক্রম করে ধাপে ধাপে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
শিক্ষাজীবনের শুরু কাকদ্বীপ বামানগর হাইস্কুলে। পরবর্তীতে খেলাধুলার সুবিধার কথা বিবেচনা করে করঞ্জলী কালিকা গার্লস স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। সেখান থেকেই অ্যাথলেটিক্সে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। পরে গাজীরমহল জি.সি. হাই স্কুল থেকে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি সম্পন্ন করে উত্তর ২৪ পরগনার অ্যাডামাস কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি কলকাতার একটি অ্যাথলেটিক্স প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যান। পরবর্তীতে দক্ষ কোচের তত্ত্বাবধানে বেঙ্গালুরুর একটি ক্রীড়া ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান।
নফিসার বাবা শফিউল্লা জমাদার একজন ক্ষুদ্র কৃষক। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিনি একসময় কাবাডি খেলায়ও যথেষ্ট দক্ষ ছিলেন। মা সিদ্দিকা খাতুন বর্তমানে এলাকার আশা কর্মী। তিনিও ছাত্রজীবনে খেলাধুলার ক্ষেত্রে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন এবং কলেজ পর্যায়ে হাইজাম্প, লংজাম্প ও দৌড় প্রতিযোগিতায় একাধিক পদক জিতেছিলেন। নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন মেয়ের মাধ্যমে পূরণ করার লক্ষ্য নিয়েই তিনি নসিফাকে ছোটবেলা থেকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়ে গিয়েছেন। আজ সেই স্বপ্নই বাস্তবে রূপান্ত হল।
নফিসার পরিবারে তিন বোন ও এক ভাই রয়েছে। বড় বোন তাবাসসুম জাহানারা স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। দ্বিতীয় বোন সোনিয়া শাহানা আইন নিয়ে পড়াশোনা করছেন। ছোট ভাই সাকিবাল পাঠান জমাদার বর্তমানে গাজীরমহল জি.সি. হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির পড়াশোনা করছে।
স্বর্ণপদক জয়ের খবর প্রকাশ্যে হোতেই রাঙাফলা গ্রামে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। নফিসাকে এক নজর দেখার জন্য বহু মানুষ তাঁর বাড়িতে ভিড় করেন। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ক্রীড়াপ্রেমী ও এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ফুলের তোড়া দিয়ে সংবর্ধনা জানান এবং আর্থিক সহায়তার হাতও বাড়িয়ে দেন।
একসময়ের গ্রামের রাস্তায় অনুশীলন করা সেই মেয়েই আজ ভারতের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বর্ণপদক জিতে প্রমাণ করে দিলেন—অদম্য ইচ্ছাশক্তি, দ্বারা কঠোর পরিশ্রম ও পরিবারের অনুপ্রেরণা থাকলে প্রত্যন্ত গ্রামের সন্তানও বিশ্বের দরবারে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে। নফিসা খাতুনের এই ঐতিহাসিক সাফল্যে গর্বিত কুলপি এলাকা, গর্বিত দক্ষিণ ২৪ পরগনা, গর্বিত সমগ্র ভারত।
Comments
Post a Comment